প্রকাশ্যে ফাঁসি নয়, প্রয়োজন দ্রুত ও নিশ্চিত বিচার
রামিসা হত্যাকাণ্ড ঘিরে জনমনে ক্ষোভ, উঠছে কঠোর শাস্তির দাবি
মোঃ আওলাদ হোসেন
সাম্প্রতিক সময়ে দেশে সংঘটিত বিভিন্ন নৃশংস অপরাধ, বিশেষ করে নারী ও শিশু নির্যাতন এবং আলোচিত রামিসা হত্যাকাণ্ডের মতো হৃদয়বিদারক ঘটনাগুলোর পর জনমনে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে রাজপথ পর্যন্ত অনেকেই দাবি তুলছেন— “ধর্ষক ও খুনিদের প্রকাশ্যে ফাঁসি দিতে হবে।”
অপরাধের ভয়াবহতা বিবেচনায় সাধারণ মানুষের এই ক্ষোভ অস্বাভাবিক নয়। তবে প্রশ্ন উঠছে— প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড কি সত্যিই অপরাধ কমানোর কার্যকর উপায়, নাকি অপরাধ দমনে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন দ্রুত, স্বচ্ছ ও নিশ্চিত বিচারব্যবস্থা?
আইন কী বলে?
বাংলাদেশের প্রচলিত আইন ও কারাবিধি অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া রয়েছে। আদালতের চূড়ান্ত রায়, আপিল নিষ্পত্তি এবং রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার সুযোগ শেষ হওয়ার পর কারাগারের ভেতরে নির্ধারিত স্থানে দণ্ড কার্যকর করা হয়।
সংবিধান প্রত্যেক নাগরিকের জন্য ন্যায়বিচার ও আইনি প্রক্রিয়ার নিশ্চয়তা দিয়েছে। একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদের সদস্য হিসেবে বাংলাদেশকেও কিছু নীতিমালা অনুসরণ করতে হয়।
শুধুই কঠোর শাস্তি কি অপরাধ কমায়?
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা বলছে, অপরাধ কমাতে শুধু কঠোর শাস্তি নয়; বরং অপরাধীর দ্রুত শনাক্তকরণ, দ্রুত বিচার এবং শাস্তি নিশ্চিত হওয়ার বিষয়টি বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক অপরাধী শাস্তির ভয় নয়, বরং ধরা না পড়ার সুযোগকেই বড় মনে করে অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। ফলে অপরাধ দমনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বিচারহীনতার সংস্কৃতি বন্ধ করা এবং আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ নিশ্চিত করা।
রামিসা হত্যাকাণ্ড আমাদের কী শিক্ষা দেয়?
রামিসার মতো মর্মান্তিক ঘটনাগুলো পুরো সমাজকে নাড়িয়ে দেয়। এমন ঘটনার পর সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা থাকে—
দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত
ফরেনসিক ও ডিজিটাল প্রমাণের সঠিক ব্যবহার
সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা
রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রভাবমুক্ত বিচার
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মামলার নিষ্পত্তি
দোষী প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা
ন্যায়বিচারের মূল উদ্দেশ্য প্রতিশোধ নয়; বরং সত্য উদঘাটন, অপরাধীর শাস্তি এবং ভবিষ্যতে এমন অপরাধ প্রতিরোধ করা।
অপরাধ প্রতিরোধে আরও যা প্রয়োজন
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধু শাস্তি নয়, সামাজিক সচেতনতা ও প্রতিরোধমূলক উদ্যোগও জরুরি। এ ক্ষেত্রে—
পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নৈতিক শিক্ষা জোরদার করা
নারী ও শিশু সুরক্ষা বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করা
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত করা
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্ত সক্ষমতা বাড়ানো
ভুক্তভোগীদের জন্য আইনি ও মানসিক সহায়তা সহজলভ্য করা
বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতা কমানো
—এসব উদ্যোগ অপরাধ কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
আমাদের ভাবার বিষয়
প্রকাশ্যে ফাঁসির দাবি অনেক সময় জনরোষের বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু একটি সভ্য রাষ্ট্রে বিচারব্যবস্থার শক্তি পরিমাপ করা হয় শাস্তির প্রদর্শনী দিয়ে নয়; বরং অপরাধী যত প্রভাবশালীই হোক না কেন, তার বিরুদ্ধে দ্রুত, নিরপেক্ষ ও নিশ্চিত বিচার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে— অপরাধ কমাতে কোনটি বেশি প্রয়োজন: প্রকাশ্য শাস্তি, নাকি দ্রুত ও নিশ্চিত বিচারব্যবস্থা?
https://shorturl.fm/gSoIY